২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৯টা ৪৫ মিনিট। সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আটতলা ভবন রানা প্লাজা ধসে পড়ে ইতিহাসের ভয়াবহতম শিল্প দুর্ঘটনার সাক্ষী হয় বাংলাদেশ। ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু আর দুই হাজারেরও বেশি মানুষের পঙ্গুত্ববরণ করার সেই ঘটনার আজ তেরো বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু আজও বিচার শেষ হয়নি, দোষীরা পায়নি চূড়ান্ত শাস্তি। দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকে থাকা বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মাঝে বিরাজ করছে চরম ক্ষোভ ও হতাশা।

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় সে সময় মোট ৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এর মধ্যে কেবল দুদকের করা সম্পদের তথ্য গোপনের মামলাটির নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি পাঁচটি মামলা এখনও বিচারাধীন:
১. হত্যা মামলা: ভবন ধসে মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের করা এই মামলাটি বর্তমানে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-৮ এ বিচারাধীন। ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ১৪৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
২. ইমারত নির্মাণ আইন মামলা: রাজউকের করা এই মামলাটি অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ঝুলে আছে। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে দীর্ঘ সময় এই মামলার কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
৩. দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা: ভবন নির্মাণে নকশা জালিয়াতি ও দুর্নীতির এই মামলাটি বর্তমানে যুক্তিতর্ক শুনানির পর্যায়ে রয়েছে।
৪. অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা: ভবন মালিক সোহেল রানার বিরুদ্ধে করা এই দুটি মামলাও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে আটকে আছে।

মামলার প্রধান আসামি রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা বর্তমানে কারাগারে আটক থাকা একমাত্র ব্যক্তি। ৪১ জন আসামির মধ্যে ভবন মালিকের বাবা আব্দুল খালেকসহ ৩ জন ইতিমধ্যে মারা গেছেন। ১২ জন আসামি এখনও পলাতক এবং বাকি ২৫ জন উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বাইরে রয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফয়সাল মাহমুদ আশা প্রকাশ করে বলেন, “গত দেড় বছরে আমরা ১০০ জনের বেশি সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়েছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির সদিচ্ছা রয়েছে। আশা করছি চলতি বছরের মধ্যেই আমরা একটি রায় পেতে পারি।”
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী মাসুদ খান খোকন দাবি করেন, “রানা বিনা বিচারে ১৩ বছর ধরে জেলে আছেন। এটি একটি দুর্ঘটনা ছিল, কোনো পরিকল্পিত হত্যা নয়। আমরা চাই দ্রুত বিচার শেষ হোক অথবা তাকে জামিন দেওয়া হোক।”
জুরাইন কবরস্থানে অশনাক্ত স্বজনদের কবরের পাশে আজও কান্নার রোল থামেনি। পঙ্গুত্ববরণকারী শ্রমিক মাসুদা বেগম বা নিলুফা ইয়াসমিনদের মতো হাজারো মানুষ আজও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের অভিযোগ, “সরকার পরিবর্তন হয়, বছর ঘুরে তেরো বছর পার হয়, কিন্তু আমরা যারা পঙ্গু হয়েছি, তারা আজও প্রকৃত বিচার বা পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পেলাম না।”
ক্লিক/এসএস



