২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত-চার বছর স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সে (এসএসএফ) দায়িত্বপালন করেছিলেন তিনি। দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা। দায়িত্বপালন করতে দেশনেত্রিকে নিরাপত্তা দেওয়াই কাল হয়ে ওঠেছিলো তরুণ পুলিশ কর্মকর্তার পেশাগত জীবনে। এসএসএফে দায়িত্বপালনের কারণে পেশাগত জীবনের ১৪টি বছর অনেকটা নির্বাসনে কাটাতে হয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জে সদ্য যোগ দেওয়া বাংলাদেশ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীকে। আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাঠ পর্যায়ের পুলিশিং থেকে তুলে প্রথমে পদায়ন করা হয় পুলিশ ট্রেনিং কলেজ (পিটিসি) খুলনাতে। সেখানে দায়িত্বপালন করতে হয় ২ বছর। এরপর ৬ বছর ছিলেন ঢাকার এসবিতে এবং ৬ বছর দায়িত্বপালন করেছেন পুলিশ একাডেমি-সারদাতে। দক্ষ ও চৌকুশ হওয়া স্বত্বেও বাহিনীতে কদর পাননি ফেনী’র অজ পাড়াগাঁও থেকে ওঠে আসা মেধাবী এই পুলিশ কর্মকর্তার। শুধু আওয়ামী সরকারের আমলেই নয় পটপরিবর্তণের পরও পরিবর্তণ হচ্ছিলোনা আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী ভাগ্যের। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও ফের তার পোস্টিং হয়েছিলো পিটিসি খুলনাতে।
বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে মুঠোফোনে আলাপ করে ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর নির্বাসনে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন এই প্রতিবেদক। তারা বলেন, আওয়ামী আমলে ত্যাগ স্বীকার করা পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্যতম একজন ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেসব পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী যোগ্যতা ও মানবিকতায় এমন একজন কর্মকর্তা যে কর্মকর্তাকে বিদায়কালে গণসংবর্ধনা দিয়েছে সিলেটবাসী। সিলেটের ইতিহাসে এই ধরণের বিদায় এর আগে কখনো কোনো পুলিশ কমিশনারের ভাগ্যে জুটেনি।
তারা আরও বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আওয়ামী আমলে ত্যাগ স্বীকার করা পুলিশ কর্মকর্তাদের একটা তালিকা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর সুনজরে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী একজন।
[ad_OwixA1az]কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রে বুদ হওয়া পাঠক ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস। চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজির কক্ষে থাকা বুকশেল্পে প্রিয় উপন্যাসিককে সাজিয়ে রেখেছেন তিনি। সেখানে আছে মুক্তিযুদ্ধের বেশ কিছু অনন্য দলিলও। সেই কক্ষে ডিআইজির সাথে অনেকটুকু সময় কাটান এই প্রতিবেদক। দীর্ঘ এই সময়ে অনেক সেবাপ্রার্থীকে দেখেছেন ফরিয়াদের ঢালি নিয়ে ডিআইজির কাছে হাজির হতে। দিনমুজুর থেকে ব্যবসায়ি, রিক্সাওয়ালা থেকে কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব-সবার অনুযোগ; অভিযোগ-মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। চেষ্টা করেন সমাধানের।
কথোপকথনে তিনি জানান, সিলেট মেট্রোপলিট পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্বপালন করতে গিয়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনেকগুলো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিলো। সেসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে নাগরিক প্রশান্তি যেমন বেড়েছিলো কমে ছিলো চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানী। জিরো টলারেন্সের কারণে মাদকও ছিলো নিয়ন্ত্রণে।
এক প্রশ্নের জবাবে আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী বলেন, রাত দেড়টা থেকে দুইটা পর্যন্ত মাঠে থাকতাম। কখনো ভোর রাত পর্যন্ত। চষে বেড়াতাম সিলেট নগরীর এই মাথা থেকে শেষ মাথা। আমার এই দৌঁড়ঝাপের কারণে থানার ওসিরা থানার চেয়ে মাঠে থাকতে হতো বেশি। নগর পুলিশের স্বশরীরে উপস্থিতি আর পিকআপভ্যানের সাঁইসাঁই সাইরেন-সিলেট নগরীর অপরাধীদের জন্য ত্রাসে পরিণত হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, সিলেট নগরী এক সময় ব্যাটারিচালিত রিক্সার চলমান জমদ্যূত ছিলো। প্রায়শ্চই দূর্ঘটনা ঘটতো। কেউ আহত হতো। সেসব দূর্ঘটনায় মারাও গেছেন অনেকেই। সিলেটের দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
সিলেট থেকে চট্টগ্রামে বদলী হয়ে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওঠা কিছু অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে অল্পভাষি এই কর্মকর্তা মৃদু হেসে বলেন, আপনি যখন ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে ওঠে নাগরিক সেবা দেওয়ার চেষ্টা করবেন তখন বন্ধুর সংখ্যা কমতে থাকবে। তারাই আপনার পথ আগলে দাঁড়াবে, অপবাদ দিবে, কুৎসা রটাবে! এর বেশি কিছু বলতে চাইনা। আল্লাহ দেখছেন। তিনিই ভালো জানেন।
বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যউপাত্ত বলছে, ১৮ বিসিএসে ক্যাডার হিসেবে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী। চাকরি জীবনের প্রথমে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্বপালন করেন এপিবিএন-চট্টগ্রাম অঞ্চলে। এরপর ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত সহকারী পুলিশ সুপার এসএসএফ, নভেম্বর ২০০৫ থেকে নভেম্বর ২০০৬ সালে দায়িত্বপালন করেছেন ইউএন মিশন- কঙ্গোতে। ডিসেম্বর ২০০৭ থেকে জুলাই ২০০৮ পর্যন্ত ছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। জুলাই ২০০৮ থেকে অক্টোবর ২০১০ পর্যন্ত দায়িত্বপালন করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজশাহী। অক্টোবর ২০১০ থেকে নভেম্বর ২০১২ পর্যন্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন পিটিসি খুলনাতে। নভেম্বর ২০১২ থেকে অক্টোবর ২০১৮ পর্যন্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন এসবি ঢাকাতে। অক্টোবর ২০১৮ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্বপাল করেছেন পুলিশ একাডেমি-সারদাতে। সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পিটিসি খুলনাতে। গতবছর (২০২৫) ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ২৬ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন সিলেটে। ২৭ জুলাই ২০২৬ ডিআইজি হিসেবে যোগ দেন চট্টগ্রাম রেঞ্জে।
আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী পড়ালেখা করেছেন ছাগলনাইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ১৯৮৮ সালে এসএসসি পাশ করেন তিনি। এরপর ১৯৯০ সালে সরকারি হাজি মহসিন কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৯৩ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে (পাস কোর্স) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস।
এসএস
[ad_ujVHoYsI]
