চট্টগ্রাম নগর ভবনে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তার অভিযান ঘিরে পুলিশ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। অভিযানের ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুর রহিমকে সিটিএসবিতে বদলি করা হয়েছে।
৭ অক্টোবর, বুধবার বিকেলে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী স্বাক্ষরিত এক আদেশে আবদুর রহিমকে সিটিএসবিতে বদলি করা হয়। একই আদেশে আকবরশাহ ও খুলশী থানায় নতুন ওসি পদায়ন করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী। আদেশে জনস্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
আদেশ অনুযায়ী, চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাজের হোসেনকে আকবরশাহ থানার ওসি করা হয়েছে। আকবরশাহ থানার ওসি মো. কামরুজ্জামানকে খুলশী থানায় বদলি করা হয়েছে। আর খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমকে সিটিএসবিতে পদায়ন করা হয়েছে।
নগর ভবনে পুলিশের অভিযান
৬ অক্টোবর, মঙ্গলবার রাতে বগা নগর ভবনে অবস্থান করছেন, এমন তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে যায় খুলশী থানা-পুলিশ। প্রথমে নগর ভবনের আশপাশের সড়কে অবস্থান নেয় পুলিশ। পরে বগাকে গ্রেপ্তারের জন্য ভবনের ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করে।
পুলিশের দাবি, বগার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হয়। তবে অভিযান চলাকালে পুলিশের সঙ্গে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের বাগ্বিতণ্ডা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে সিএমপির উপকমিশনার ফয়সাল আহমেদ উপস্থিত হন। পরে মেয়রের হস্তক্ষেপে পুলিশ বগাকে গ্রেপ্তার না করেই নগর ভবন থেকে ফিরে যায় বলে সূত্রের দাবি।
তবে সিএমপির সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশীদ বলেন, নগর ভবনের আশপাশে পুলিশের গোয়েন্দা দল বগাকে গ্রেপ্তারের জন্য অবস্থান করছিল। তবে তাকে পাওয়া যায়নি। তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
মেয়রের দাবি, নগর ভবনে বগা ছিলেন না
অভিযান নিয়ে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের দাবি, বগা নগর ভবনের ভেতরে ছিলেন না। ওয়াকিল হোসেনের দুই ভাই খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে তার কাছে এসেছিলেন। মেয়র হিসেবে তিনি তাদের অভিযোগ শুনেছেন, এর বাইরে তার কোনো ভূমিকা ছিল না।
মেয়র বলেন, কেউ যদি ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হন, তাকে গ্রেপ্তার করা পুলিশের দায়িত্ব। এ ঘটনায় তার কোনো ভূমিকা নেই। সামনে নির্বাচন থাকায় তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই ঘটনাটি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বগা নগর ভবন এলাকায় অবস্থান করছেন, এমন তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হয়েছিল।
সাংবাদিকদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়
নগর ভবনে পুলিশের অভিযানকে কেন্দ্র করে সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের সঙ্গেও মেয়রের অনুসারীদের বাগ্বিতণ্ডা ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া ও আছড়ে ফেলার অভিযোগও রয়েছে।
আল জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের ফেসবুক পেজে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে সাংবাদিকদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের দৃশ্য দেখা যায়। একপর্যায়ে মেয়র সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা এখানে কী জন্য এসেছেন? সিটি করপোরেশনে ১০০ জন মানুষ আসবে। আপনারা চলে যান।’
ঘটনার বিষয়ে মেয়রের বক্তব্য, নগর ভবনে বগা ছিলেন না। তার দুই ভাই ওসি আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন। তিনি শুধু তাদের অভিযোগ শুনেছেন।
১৭ মামলার আসামি বগা
ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি মেয়র শাহাদাত হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগে গত ৮ জুন তাকে স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র, বিস্ফোরক, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে খুলশী, পাহাড়তলী ও আকবরশাহ থানায় তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৭টি মামলা রয়েছে। পুলিশের অন্য এক বক্তব্যে মামলার সংখ্যা ২৩টি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্প্রতি পাহাড়তলী ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মিজানুর রহমানকে তুলে নিয়ে মারধর এবং কলেজের অধ্যক্ষকে ভিডিওকলে রেখে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় বগাকে আসামি করা হয়।
এর আগে গত ৪ সেপ্টেম্বর খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনি এলাকায় বগাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশের দাবি, সে সময় বগার অনুসারীরা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ও ককটেলসদৃশ বস্তু নিক্ষেপ করেন। এতে খুলশী থানার ওসিসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। ওই সময় বগা তার বাসার একটি গোপন সুড়ঙ্গপথ দিয়ে পালিয়ে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের বিরুদ্ধে বগার বাবার মামলা
বগার বাসায় পুলিশের অভিযানের ঘটনায় গত ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন তার বাবা জাবেদ। মামলায় খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমসহ আটজনকে আসামি করা হয়।
মামলায় পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট, মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ করা হয়েছে। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন।
কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ
গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনির তালতলা এলাকায় হৃদয় নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় আট কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, নিহত হৃদয় ‘ফাইভ স্টার’ নামের একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ছিলেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ‘সেভেন স্টার’ গ্যাংয়ের সদস্য। দুই গ্যাংয়ের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে।
পুলিশের দাবি, ‘সেভেন স্টার’ গ্যাং পরিচালনার সঙ্গে ওয়াকিল হোসেন বগা ও রকিবুল ইসলাম ওরফে পিচ্চির সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বগার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, মঙ্গলবার খুলশীতে চাঁদাবাজি ও ভাঙচুরের মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার তিনজন বগার সহযোগী।
ওসি বদলি ঘিরে নতুন আলোচনা
নগর ভবনে বগাকে গ্রেপ্তার অভিযান, মেয়রের সঙ্গে পুলিশের বাগ্বিতণ্ডা এবং এর পরদিনই খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমের বদলি নিয়ে চট্টগ্রামে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
একদিকে পুলিশ বলছে, বগা একজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে মেয়রের দাবি, নগর ভবনে কোনো ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ছিলেন না এবং ঘটনাটি তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
নগর ভবনে সেদিন বগা আদৌ ছিলেন কি না এবং তাকে গ্রেপ্তারের অভিযানে কারা বাধা দিয়েছিল, তা নিয়ে পুলিশ ও মেয়রের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। এর মধ্যেই খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমকে সিটিএসবিতে বদলি করায় ঘটনাটি নিয়ে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এসএস
