বাংলাদেশ সরকারের মেয়াদের মাত্র তিন মাসের মাথায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পদত্যাগপত্রে তিনি স্বাস্থ্যগত কারণ উল্লেখ করলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বাস্তবতা, মন্ত্রণালয়কে ঘিরে চলমান টানাপোড়েন এবং স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে এই পদত্যাগকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো একটি স্পর্শকাতর অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা একজন পূর্ণমন্ত্রীর আকস্মিক বিদায়কে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত বিষয় হিসেবে দেখছেন না অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তাদের মতে, এই পদত্যাগের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব দেশের সীমানা ছাড়িয়েও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে, পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাঙামাটি শহরে তার সমর্থক নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সোমবার বিকেল থেকে শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন সমর্থকরা। পরে তারা দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, একজন প্রতিমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ চাপ এবং বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্রের কারণে দীপেন দেওয়ানকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং তার পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান।

রাঙামাটি জেলা বিএনপির নেতা ও বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম পনির বলেন, “দীপেন দেওয়ানের মতো একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন। এটি তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বিশ্বাস করেন না। আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি বিবেচনা করে তার পদত্যাগপত্র ফিরিয়ে দিয়ে তাকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা প্রদান করবেন।”
এদিকে বিএনপি নেতা সাজাই মারমা, সদ্য বিদায়ী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর সুমনসহ তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও দাবি করেছেন, দীপেন দেওয়ানকে পরিকল্পিতভাবে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তারা তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে তা ফিরিয়ে দেওয়ার এবং তাকে পুনরায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন।
নেতাকর্মীদের মতে, দীপেন দেওয়ান দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতা, সততা ও গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার পদত্যাগের খবরে তৃণমূল পর্যায়ে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা দ্রুত এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, কূটনৈতিক মিশন এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিশেষ পর্যবেক্ষণের আওতায় রয়েছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর থেকে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থা এ অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং শান্তি প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসছে।
এ কারণে পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যেকোনো বড় ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই স্বাভাবিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন মন্ত্রীর আকস্মিক পদত্যাগ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন কী ঘটেছে, যা একজন জনপ্রতিনিধিকে এত দ্রুত দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য করল?
দীপেন দেওয়ান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন আলোচনা রয়েছে। মন্ত্রীত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাঙামাটি জেলা বিএনপির সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ছিল বলে দলীয় সূত্রে আলোচনা রয়েছে।
জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, ছাত্রদল ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি গঠন, পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তিনি একাধিক চাপের মুখে ছিলেন বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।
বিশেষ করে পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠনকে ঘিরে রাজনৈতিক সুপারিশ, লবিং, তদবির এবং প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা মন্ত্রণালয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে।ৎ
এসএস



