কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আজ মঙ্গলবার বিকালে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সরকার গঠনের সাথে সাথে প্রধান উপদেষ্টার পদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই হিসাবে আজই প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের শেষ কার্যদিবস।

গতকাল জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বলেছেন, “আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ি যেখানে সম্ভাবনা সীমাহীন, আর স্বপ্নের কোনও সীমানা নেই। গত ১৮ মাসে ক্রমান্বয়ে এদেশের মানুষের মধ্যে গণতন্ত্র, কল্যাণমূলক শাসনব্যবস্থা, বাক-স্বাধীনতা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন ও সমালোচনা করতে পারা এবং জবাবদিহিতায় আনতে পারার যে চর্চা শুরু হলো সেটি যেন কোনোরকমেই হাতছাড়া হয়ে না যায়।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের আপামর জনগণ ও সকল রাজনৈতিক পক্ষ ইস্পাত কঠিন ঐক্যের মাধ্যমে এ ধারাকে আগামী দিনগুলোতে রক্ষা করবে, সমৃদ্ধ করবে। অধিকারের বিষয়ে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিষয়ে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে দৃঢ় থাকতে হবে। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে আহ্বান জানাই, একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে। এ আহ্বান জানিয়েই আমি অত্যন্ত আশাবাদের সঙ্গে বিদায় নিচ্ছি।”

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যে বাংলাদেশ শুধু স্বল্পমূল্যের শ্রমনির্ভর অর্থনীতি নয় বরং দক্ষতা, প্রযুক্তি ও মূল্য সংযোজনভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হবে। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই—এ সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে তিনটি বিষয়ের কোনও বিকল্প নেই; শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সততা।”
তিনি বলেন, “অতীতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সীমাহীন দুর্নীতি, অসততা, অনিয়ম ও জালিয়াতিকে উৎসাহিত করা হয়েছিলো। সেই সংস্কৃতি আমাদের পেছনে টেনে রেখেছিলো, বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করেছিলো। নতুন বাংলাদেশকে সেই পথ থেকে সরে আসতে হবে। আমাদেরকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে নিয়ম মানায়, প্রতিশ্রুতি রক্ষায়, মান বজায় রাখায়, রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরকে দুর্নীতিমুক্ত করায়, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করায়।”
ড. ইউনুস বলেন, “আমরা শূন্য থেকে শুরু করিনি, শুরু করেছি মাইনাস থেকে। ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে তারপর সংস্কারের পথ ধরেছি। আজ অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিচ্ছে। কিন্তু গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, বাক-স্বাধীনতা ও অধিকার চর্চার যে ধারা শুরু হয়েছে তা যেন কখনও থেমে না যায়।
আমরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে গেলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার সার্বিক দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার। আমাদের সকলের দায়িত্ব দেশকে সত্যিকারের গণতন্ত্র হিসেবে পরিস্ফুটিত করা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের জন্য এ দরজা খুলে দিয়েছে। আমরা যদি স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও শক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।”
তিনি আরও বলেন, “গণ-অভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছে, শরীরের অঙ্গ হারিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে, যাদের লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে, যাদের লাশ এখনও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, যারা অল্পের জন্য বেঁচে গেছে তাদের সকলের আত্মত্যাগকে এ জাতি যেন কোনোদিন ভুলে না যায়। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় যেন আমরা তাদের ছবি মনে রেখে সিদ্ধান্ত নেয়। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ক্ষমতাবানদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় সে শিক্ষাটি যেন দিয়ে যেতে পারি। ক্ষমতাবানদের ক্ষমতা মানুষকে কি রকম মনুষ্যত্বহীন করে তুলতে পারে সেটা জাতির ইতিহাসে ধরে রাখার জন্য আমরা পলাতক প্রধানমন্ত্রীর বাসস্থান গণভবনকে জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে রেখে যাচ্ছি। এখানে আপনাদের স্মৃতির বাস্তব নমুনা সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। জাদুঘর যখন জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হবে তখন আপনি যেখানেই থাকুন, আমি অনুরোধ করবো আপনি সপরিবারে একবার এসে কিছুক্ষণ জাদুঘরে কাটিয়ে যাবেন।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন বিশ্বখ্যাত এই অর্থনীতিবিদ। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা বুঝিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে। আজ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এবং বিকেলে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ গ্রহণ করবেন। এই শপথের মধ্য দিয়েই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে এবং ড. ইউনূস তাঁর দায়িত্ব থেকে বিদায় নেবেন।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবারের জাতীয় নির্বাচনে ২১২টি আসনে বিজয়ী হয়ে পরবর্তী সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন।
এসএস



