আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী ও চান্দগাঁও আংশিক) আসনটি শেষ পর্যন্ত এনসিপিকে ছেড়ে দিয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। তবে আসনটিতে জামায়াতের জনপ্রিয় প্রার্থী ডা. আবু নাসেরের সমর্থকরা বিষয়টি মেনে না নিয়ে শুরু করে আন্দোলন। একপর্যায়ে তারা নাসেরের সমর্থনে চালাতে থাকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রচারণা। জামায়াতের দায়িত্বশীল কয়েকজন ব্যক্তি সাথে থাকলেও কর্মী সমর্থকদেরকে কাছে পাচ্ছেন না এনসিপির প্রার্থী জোবায়রুল হাসান আরিফ। স্থানীয় বাসিন্দা না হওয়ায় এবং ওই আসনে এনসিপির সাংগঠনিক অবস্থান না থাকায় অনেকটা বেকায়দায় আছেন শাপলা কলি প্রতীকের আরিফ।

জানা গেছে, ১১ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন এনসিপি জোবায়রুল আরিফ। জামায়াত প্রার্থী ডা. আবু নাছের সংগঠনের সিদ্ধান্ত মেনে গত ৮ দিন কোনো প্রচারণা চালাননি। তাকে ২ ফেব্রুয়ারী চট্টগ্রামে জামায়াত আমীরের সমাবেশেও দেখা যায়নি। কিন্তু ৪ ফেব্রুয়ারী থেকে চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করতে দেখা গেছে। এর আগে ৮ দিন তিনি গণসংযোগ না করলেও স্থানীয়ভাবে তার অনুসারীরা ছিল সরব। জামায়াত ও শিবিরের সাংগঠনিক নেতাদের কাউকে গত ৮ দিন ডা. আবু নাছেরের পক্ষে কোনো গণসংযোগে অংশ নিতে দেখা যায়নি।
জানা গেছে, বোয়ালখালী উপজেলার নায়েবে আমীর ডা. আবু নাছের চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে জামায়াতের সবুজ সংকেত পেয়ে এই আসনে প্রচারণা চালিয়ে বেশ আলোচিত হন। বোয়ালখালীর এই বাসিন্দার দলে বড় পদ না থাকলেও নিজে চিকিৎসক নেতা এবং চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ও চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হওয়ায় স্থানীয়দের কাছে বেশ পরিচিত পান তিনি। এছাড়া বোয়ালখালী ও চান্দগাঁও থানা এলাকার বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও তিনি সম্পৃক্ত।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়,প্রায় তিন দশক ধরে চান্দগাঁও ও বোয়ালখালী এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত ডা. আবু নাসের। দেড় বছর ধরে উঠান বৈঠক, মেডিকেল ক্যাম্প ও সামাজিক সহায়তা দিয়ে ভোটের মাঠে আলোচনায় আছেন তিনি। এসব কারণে দলীয় গণ্ডির বাইরে তাঁর রয়েছে বিশাল ব্যক্তিগত অনুসারী। জামায়াতের সাংগঠনিক নেতারা ১১ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত মেনে ডা. নাছেরের পক্ষে গণসংযোগ থেকে বিরত থাকলেও তাঁর অনুসারীরা এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। তারা ডা. আবু নাসেরের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
দলীয় সূত্র জানায়, গত ২৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সফরে এসে এনসিপির শীর্ষ নেতারা বিষয়টির জটিলতা উপলব্ধি করেন। ওইদিন বোয়ালখালীর পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত রেখে এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলাম নগরের একটি হোটেলে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সেখানে জামায়াত নেতারা দাবি করেন, এনসিপির মনোনীত প্রার্থী জোবাইরুল ইসলাম আরিফকে নিয়ে মাঠে ইতিবাচক সাড়া নেই। তাদের ভাষ্য—এই আসনে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা ডা. আবু নাছেরের বিকল্প নেই।
একই দিনে বোয়ালখালীতে উপস্থিত হন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তবে সেখানে গিয়ে তিনি স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ওমর ফারুকের মা রুবি আক্তার প্রকাশ্যে বলেন, জোটের চেয়ে জনগণের মতামত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উন্মুক্ত নির্বাচন অথবা ডা. আবু নাছেরকে বহাল রাখার দাবি জানান।
এরপর কুমিল্লায় এনসিপি ও জামায়াতের নেতাদের আরেক দফা রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। সে বৈঠকেও চট্টগ্রাম-৮ আসন নিয়ে পুনর্বিবেচনার আশ্বাস মিললেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়নি। পরিস্থিতির মধ্যে জোবাইরুল ইসলাম আরিফ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন—এমন আলোচনা শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত সেটি বাস্তবতা পায়নি।
জামায়াতের একাধিক নেতা জানান, এনসিপির প্রার্থী আরিফ নিজ দলেই পূর্ণ সমর্থন পাচ্ছেন না। তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রধানত সাতকানিয়া কেন্দ্রিক হলেও বোয়ালখালী ও মহানগর এলাকায় তার পরিচিতি সীমিত। এমনকি চট্টগ্রাম-৮ আসনের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও তার উপস্থিতি ছিল কম।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াত ইসলামীর এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম-৮ আসনে জোটের সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। তবে এই আসনে ডা. আবু নাছের ভাইয়ের প্রতি জনগণের সমর্থনের বিরোধী করা শক্তিও আমাদের নেই।
চট্টগ্রাম-৮ আসনের জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে পরিচিত ডা. মো. আবু নাছের বলেন, ১১ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তের কারণে আমি গত ৮ দিন কোনো প্রচারণায় বের হয়নি। বাসাতেই ছিলাম। কিন্তু বোয়ালখালী ও চান্দগাঁও এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আমার সঙ্গে কাজ করা সাধারণ মানুষ আমাকে বাসা থেকে বের করে এনেছে। এখন আমার উপায় কি? আমি এই জনপদ ছেড়েতো আর চলে যেতে পারবো না। তাদের মায়া আমি কি করে ত্যাগ করবো? আমাকে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করছে।
এদিকে বিষয়ে জানতে এনসিপি প্রার্থী জোবায়রুল হাসান আরিফকে বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।তবে এর আগে জোবায়রুল আরিফ সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ তুলেন।
এসএস



