শনিবার, মে ৩০, ২০২৬

বাকলিয়ায় শিশু ধর্ষণ: জনতার বেশে আ’লীগের কর্মীরাও জড়িয়েছে সংঘর্ষে

ডেস্ক রিপোর্ট

চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় তিন বছরের এক শিশু কন্যাকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করে চেয়ারম্যানঘাটা আবু জাফর রোড এলাকায়। অভিযুক্ত যুবককে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষুব্ধ লোকজন সড়ক অবরোধ, পুলিশের গাড়ি আটকে দেওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়। পরে একটি পুলিশ ভ্যানে আগুনও দেওয়া হয়। পরে বিদ্যুৎ বন্ধ করে অভিযুক্তকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে কৌশলে বাকলিয়া থানায় নেওয়া হয়। এ সময় জনতার বেশে আওয়ামী লীগের কর্মীরাও পুলিশের ওপর হামলায় অংশগ্রহণ নেয়।

২২ মে, শুক্রবার বাকলিয়া থানার এক কর্মকর্তা জানান, ভুক্তভোগী শিশুর পিতা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অভিযুক্ত মনিরকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে শিশুটিকে তার নানী–নানাসহ সবাই খোঁজাখুঁজির পর বিকেলে পাশের বিসমিল্লাহ ভবনের সিঁড়িঘরে কান্নারত অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয়রা। এসময় শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে তার নানী–নানাসহ সবাই ধারণা করেন, সে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এসময় পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে দ্রুত চমেক হাসপাতালে নিয়ে যায়। বর্তমানে শিশুটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ এ চিকিৎসাধীন রয়েছে বলে জানান শিশুটির চাচা মাসুম। মুহূর্তেই ঘটনাটি এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত মনির হোসেনকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করতে যায়।পরে সেখানে হাজির হয় বাকলিয়া থানা পুলিশ।

অভিযুক্তকে ভবন থেকে বের করে আনার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের গাড়ি ঘিরে ফেলে। এসময় জনতার বেশে লুটপাট করতে যায় একটি চক্র। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে পুলিশ সদস্যরা কৌশলের আশ্রয় নেয়। ওই সময় পুলিশ সদস্যদেরকে প্রায় ছয় ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখ হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সদস্যদের পিছু হটে ভবনের ভেতরে অবস্থান নিতে হয়। এ সময় জনতা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। অভিযুক্তকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে পুলিশের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান তারা।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, ফাঁকা গুলি ছোড়ে পুলিশ। রাত সোয়া ১০টার দিকে এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে অভিযুক্তকে ভবন থেকে বের করে পুলিশের পোশাক পরিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার ভিড়ের মধ্য দিয়েই বাকলিয়া থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযুক্তকে থানায় নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্থানীয়রা। তাঁরা পুলিশের একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি অতিরিক্ত এপিবিএন সদস্য মোতায়েন করা হয়।

রাত ১২টার দিকে উত্তেজিত লোকজন ঢাকা-চট্রগ্রাম সড়কে অবস্থান নেন এবং টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা। পুলিশও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, ফাঁকা গুলি ছুড়ে। সংঘর্ষে পুলিশ, বিক্ষোভকারীসহ দায়িত্ব পালনকারী সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।

পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, ভবনটির কক্ষে শিশুটিকে রেখে মা পোশাক কারখানায় কাজে যান এবং বাবা রিকশা চালাতে বের হন। পরে তাদের মেয়েকে একা পেয়ে পাশের ডেকোরেশন দোকানের কর্মচারী মনির (৩২) ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ ওঠে। শিশুটির অবস্থা গুরুতর হওয়ায় রাতেই তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়।

স্থানীয়রা জানায়, ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গা থেকে জনতার বেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এসে পুলিশের ওপর হামলা করে। তাদের সাথে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসময় ঘটনাস্থলে দেখা যায়, কর্ণফুলী উপজেলার চার পাথরঘাটা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আরমান হায়দার (৩৪), ৩১ নং আলকরন ওর্য়াডের দোভাস কলোনীর বাসিন্দা ও কোতোয়ালি থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক আমজাদ হোসেন রুবেল (৩৫), সদরঘাট রোডের সাবেক কাউন্সিলর রেখা আলমের বাড়ীর পাশে দোতলার আবু কাউসারের ভাগিনা মোহাম্মদ জুয়েল প্রকাশ (কল্লা শাহ জুয়েল) (৩৬), চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের ক্রীড়া সম্পাদক আশিক রহমান (৩৬) ও ২৯ নং পশ্চিম মাদারবাড়ী ওর্য়াড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ – সম্পাদক মিনহাজ মাসুমকে (২৯)। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে জানিয়েছে, বাকলিয়ায় আমাদের দলের ওয়ার্ড সভাপতিকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হলো।

সদরঘাট থানার বাসিন্দা এক যুবদল নেতা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে ওই এলাকা থেকে সাবেক ছাত্রলীগের অনেকেই ওখানে গিয়েছিল এবং ভাংচুরের ঘটনা ঘটায়।

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদক আশিকুর রহমান বলেন,আমরাও দেখেছি ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায় এবং গাড়িতে আগুন দিয়ে ঘটনাটিকে ঘোলাটে করার চেষ্টা করে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপ-পরিদর্শক সোহেল রানা জানান, শিশুটির অবস্থা এখন আগের চেয়ে ভালো এবং সে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, বিকেলে ধর্ষণের অভিযোগ শুনে পুলিশ গিয়ে সন্দেহভাজনকে আটক করে। আমরা গিয়ে দেখি সেখানে দুই থেকে তিনশ লোক জড়ো হয়ে গেছে। তারা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চায়। তারা অভিযুক্তকে মেরে ফেলতে চায়, দেশে তো আইন আছে! ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে দুষ্কৃতকারীরা জড়ো হয়ে আমাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। সিটিজেন ফোরামের সহায়তায় আমরা সেখান থেকে বের হয়ে আসামিকে হেফাজতে নিয়েছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।

নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ বলেন, আত্মরক্ষার্থে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলি ছুড়েছে। এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সুযোগে কৌশলে অভিযুক্তকে সরিয়ে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

এসএস

[Image not available]
  • পঠিত
  • সর্বশেষ

সম্পর্কিত