মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের বার্তা পাঠাচ্ছে হিমালয়

চট্টগ্রামমেইল২৪ ডেস্ক

বিখ্যাত পর্বতারোহী তেনজিং নরগে শেরপার রোমাঞ্চকর জীবনের ওপর নির্মিত নতুন একটি বায়োপিক মুক্তি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে তার ছেলে জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তন হিমালয়কে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে এবং পর্বতারোহণকে ক্রমেই বিপজ্জনক করে তুলছে।

২ অক্টোবর, শুক্রবার অ্যাপল টিভিতে মুক্তি পেয়েছে চলচ্চিত্র ‘তেনজিং’। ছবিটিতে ১৯৫৩ সালে প্রথমবারের মতো মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের সেই অবিস্মরণীয় ও রোমাঞ্চকর অভিযানের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

সিনেমাটির পুরো কাহিনীটি তুলে ধরা হয়েছে তেনজিং নোরগে শেরপার দৃষ্টিকোণ থেকে, যেখানে এডমন্ড হিলারিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এমন এক অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন, যা পর্বতারোহণের ইতিহাস চিরতরে বদলে দেয়।

বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে শেরপার পা রাখার সাত দশকেরও বেশি সময় পর, নেপাল এখন এক ভয়াবহ বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। এই দুর্যোগ পর্বতাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক চিত্রটি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তেনজিং নরগের ৬১ বছর বয়সী ছেলে জামলিং তেনজিং বলেন, এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ স্রেফ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের সবার জন্য এক চরম সতর্কবার্তা।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নেপাল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ দেশের প্রায় অর্ধেক এলাকাই পাহাড়ে ঘেরা।

উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, পাহাড়ের এই পরিবর্তন কেবল উঁচু এলাকাতেই থেমে থাকছে না, নদীর অববাহিকায় নিচের উপত্যকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষের জীবনকেও সংকটের মুখে ফেলছে।

মাত্র দুই বছর আগের কথা স্মরণ করে জামলিং জানান, ৩,৮০০ মিটার (১২,৪৬০ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত বাবার জন্মগ্রাম ‘থামে’ কীভাবে চোখের সামনে ভেসে গিয়েছিল। একটি হিমবাহ-হ্রদের বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট সেই পাহাড়ি ঢল গ্রামটিকে তছনছ করে দেয়।

তিনি বলেন, এটি এখন সবচেয়ে বড় হুমকি। হিমবাহ যখন গলতে শুরু করে, তখন হ্রদের পানির চাপ বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে বাঁধ ভেঙে চারপাশ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ঠিক এই ভয়াবহ ব্যাপারটিই এখন নিয়মিত ঘটছে।

নিজের গ্রামের নির্মম স্মৃতি মনে করে তিনি বলেন, ঠিক এই বিপর্যয়টিই ঘটেছিল থামে গ্রামে। বন্যায় মুহূর্তের মধ্যে পুরো গ্রামের অর্ধেক অংশ মানচিত্র থেকে মুছে গিয়েছিল।

১৯৯৬ সালে জামলিং নিজেও বাবার পথ ধরে এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখেন। মাত্র আট বছর বয়স থেকে এই স্বপ্নটি তিনি লালন করছিলেন।

বাবার প্রতি গভীর অনুরাগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমি বাবাকেই জীবনের সেরা অনুপ্রেরণা মনে করতাম। আমার চোখে তিনিই ছিলেন আসল নায়ক, আর আমি ঠিক তার মতোই সাহসী হতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু সেই এভারেস্টের বুকেও এখন জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট কালো ছায়া ও ক্ষতচিহ্ন ফুটে উঠেছে।

জামলিং জানান, গাইডরা এখন প্রায় ৬,৪০০ মিটার (২১,০০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত ‘ক্যাম্প- ২’-এ পানি জমে থাকতে দেখছেন। আগে সেখানে কখনোই পানি দেখা যেত না। ওই উচ্চতায় সবসময়ই জমাটবাঁধা বরফ থাকত।

তিনি আরও বলেন, বাবার অভিযানের সময়ের সঙ্গে বর্তমান পর্বতের ছবির তুলনা করলেই স্পষ্ট বোঝা যায় হিমবাহগুলো কতটা গলেছে।

পর্বতারোহী ও গাইড হিসেবে কর্মরত স্থানীয় শেরপা সম্প্রদায়ের জন্য এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনগুলো তাদের পেশাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে; এর সাথে যুক্ত হয়েছে অনিশ্চিত আবহাওয়া এবং ঘন ঘন তুষারধসের ঘটনা।

তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা মোকাবিলায় প্রধান দায়িত্বটি মূলত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশগুলোর ওপরই বর্তায়। এটি কেবল আমাদের হিমালয়েই আঘাত হানছে না; এটি ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেলছে, ভয়াবহ দাবানলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকা পুড়েছে।

তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, আমরা যদি এখনই আমাদের গ্রহের যত্ন নেওয়া শুরু না করি, তবে ভবিষ্যতে এর জন্য আমাদের সবাইকে অত্যন্ত চড়া মূল্য দিতে হবে।

বাবার ওপর তৈরি বায়োপিক নিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে জামলিং বলেন, আমার বাবার জীবন আর সংগ্রাম নিয়ে এমন একটি ছবি অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। এই পথিকৃৎ পর্বতারোহী কখনো তার প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি পাননি। তবে তিনি নিজে এসব নিয়ে কখনোই মাথা ঘামাননি। নাম কুড়ানো বা খ্যাতির মোহে তিনি পাহাড়ে চড়েননি; চড়েছিলেন পাহাড়ের প্রতি নিজের ব্যাকুল ভালোবাসা আর চূড়ায় ওঠার আজন্ম স্বপ্নের টানে।

তেনজিং নরগের এই সাহসিকতা ও সফলতার পর থেকেই মূলত ‘শেরপা’ শব্দটি বীরত্ব ও নির্ভরযোগ্য পর্বতারোহী গাইডের এক বিশ্বজনীন সমার্থক শব্দে পরিণত হয়।

জামলিং জানান, যদিও তার বাবার কাছে পর্বত ছিল আবেগের বিষয় এবং অনেক নেপালি পর্বতারোহী এখন স্বীকৃতি পাচ্ছেন, তবুও এই পর্বতারোহণ শিল্পটি মূলত টিকে আছে আর্থিক প্রয়োজনে।

তিনি বলেন, আজকের দিনে শেরপারা পাহাড়ে ওঠে মূলত সন্তানদের পেটে দুবেলা খাবার দিতে এবং তাদের ভালো শিক্ষা নিশ্চিত করতে, যাতে তাদের সন্তানদেরও ভবিষ্যতে এই একই ঝুঁকির কাজ করতে না হয়।

অর্থনৈতিক এই নির্ভরতার কারণেই হিমালয়ের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি স্থানীয় শেরপা সম্প্রদায়ের কাছে জীবন-জীবিকার অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জামলিং তার বাবার স্মৃতিচারণ করে বলেন, বাবা জীবিত থাকা অবস্থায়, অর্থাৎ আশি দশকের আগে পর্যন্ত কেউই জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ভাবেনি বা কথা বলেনি, কারণ তখন আমরা এমন দৃশ্যত পরিবর্তনগুলো দেখিনি। কিন্তু আজ আমরা এই কঠিন সত্যটা হাতেনাতে টের পাচ্ছি।

সূত্র: এএফপি

এসএস

[ad_nfYePqtZ]
  • পঠিত
  • সর্বশেষ

সম্পর্কিত