শুক্রবার, এপ্রিল ১৭, ২০২৬

বিএনপির ছত্রছায়ায় মিরসরাইয়ে দুই যুবলীগ নেতার আধিপত্য!

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে দীর্ঘদিন ধরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসা যুবলীগের দুই ভাই এখন বিএনপির ছায়াতলে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও তারা রাজনৈতিক পরিচয় বদলিয়েছে, কিন্তু তাদের দখলবাজি, চাঁদাবাজি, বন উজাড়, অস্ত্র ব্যবসা ও খুন-জখমের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ড থেমে নেই বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।

অভিযুক্তরা হলেন মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন নয়ন ও ইখতিয়ার হোসেন পুনম। তারা উপজেলার বড়তাকিয়া বাজার সংলগ্ন পূর্ব খৈয়াছড়া গ্রামের মৃত আবু ইউছুপ (ওরফে খোকার) ছেলে। তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, সরকারি জমি দখল, বন বিভাগের সেগুন গাছ কেটে পাচার, খুন-জখমসহ নানা গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তে জানা যায়, আবু ইউছুপের চার ছেলে রয়েছে। বড় ছেলে রাজউকের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে ঢাকায় কর্মরত, তৃতীয় ছেলে একটি সি অ্যান্ড এফ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। দ্বিতীয় ছেলে এনায়েত হোসেন নয়ন ও চতুর্থ ছেলে ইখতিয়ার হোসেন পুনম দীর্ঘদিন ধরে যুবলীগ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নয়ন ও পুনম যুবলীগের নাম ব্যবহার করে বড়তাকিয়া ও আশপাশের এলাকায় একপ্রকার ‘অঘোষিত শাসন’ চালাতো। সড়ক ও জনপথ বিভাগের জমি দখল করে দোকানঘর নির্মাণ ও ভাড়া দেওয়া, বন বিভাগের সেগুন গাছ কেটে পাচার তাদের নিয়মিত কর্মকাণ্ড ছিল।

এছাড়া, স্থানীয় এক ব্যক্তি নীল রতন চাকমা দীর্ঘদিন একই স্থানে চাকরি করার সুবাদে এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে সরকারি খালি জমি সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করতেন। এই তথ্যের ভিত্তিতেই পুনম-নয়নের দখলদারির নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয়।

ইখতিয়ার হোসেন পুনম ‘অস্ত্র ব্যবসায়ী পুনম’ নামে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে জমি দখলের কন্ট্রাক্ট নেওয়া, বন থেকে সেগুন গাছ চোরাই কাটা, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ডাকাতির নেতৃত্ব দেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বড়তাকিয়া বাজারে দিনদুপুরে মহিউদ্দিন নামের এক সবজি ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইখতিয়ার হোসেন পুনমের নেতৃত্ব ছিল বলে স্থানীয়রা জানায়। হত্যার কারণ ছিল পুনমের চাঁদার দাবিতে সম্মতি না দেওয়া। তবে পুলিশ প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো বিএনপি কর্মীসহ সাধারণ মানুষকে হয়রানির শিকার করেছে।

মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বড়তাকিয়া এলাকায় পূর্বেও বেশ কিছু হত্যাকাণ্ডের পেছনে এনায়েত নয়ন ও পুনমের প্রত্যক্ষ মদদ থাকার অভিযোগ রয়েছে। তারা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের আশ্রয়ে থেকে এইসব অপরাধ থেকে বেঁচে আসছে। তাদের বড় ভাই নিশান হোসেন রাজউকে কর্মরত এবং প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে তাদের রক্ষা করে আসছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানকালে এই দুই ভাই আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়, বহু মানুষ আহত হয়, তবুও তারা আইনের আওতায় আসেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর কিছু সময় আত্মগোপনে থাকলেও পরে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে পুনরায় এলাকায় সক্রিয় হয়। অভিযোগ রয়েছে, বড় অঙ্কের অর্থ বিনিময়ে বিএনপি নেতারা তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে নতুন করে সন্ত্রাস চালানোর সুযোগ দিয়েছে।

সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকার পরও দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে স্থানীয় জনমনে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেকে বলছেন, শুধু দুই ভাই নয়, তাদের আশ্রয়দাতা রাজউক কর্মচারী বড় ভাই নিশান হোসেন ও মিরসরাইয়ের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারাও দায় এড়াতে পারবে না।

[Image not available]
  • পঠিত
  • সর্বশেষ

সম্পর্কিত